
রিপন কান্তি গুণ, নেত্রকোনা প্রতিনিধি;
একসময়ে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় আয়োজন করা হতো গ্রামবাংলার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার। যাত্রাপালা দেখার জন্য গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে যেতেন সব বয়সের মানুষ। অথচ বর্তমান আধুনিক যুগে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, হাতের মুঠোয় বিনোদনের সহজলভ্যতা, অশ্লীল নৃত্য আর জুয়ার আবর্তে পড়ে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার এককালের বড় চিত্তবিনোদন শিল্প যাত্রাপালা।
একসময়ে প্রতি বছর শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে শুরু হতো যাত্রাপালা। স্কুল-কলেজের খেলার মাঠ, বাজার, নদীর পাড়, ধান কাটার পর জমিতে আয়োজন করা হতো গ্রামবাংলার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার। অনেক সময় কোনো সংস্থার উদ্যোগে যাত্রাদল আনা হতো, তাদের সঙ্গে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে। আবার কোন কোন এলাকার সৌখিন শিল্পীদের উদ্যোগে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন ঐতিহাসিক বা সামাজিক যাত্রাপালার। তখন ঘণ কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নামলেই লাউড স্পিকারে ভেসে আসত- ‘হৈ হৈ কান্ড আর রৈ রৈ ব্যাপার…অদ্য রজনীর বিশেষ আকর্ষণ…’। এখন আর যাত্রাপালা দেখার জন্য দর্শকরা রাতভর বিনিদ্র থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আর অপেক্ষায় প্রহর গোণেন না। শীতে মেলা বসবে, যাত্রাপালা আসবে-সেই প্রতীক্ষায় থাকে না গ্রামের মানুষ। যাত্রামঞ্চ থেকে আজ হারিয়ে গেছে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, নাচ ঘরের কান্না, রহিম রূপবান, কমলার বনবাস, গুনাইবিবি, লাইলী-মজনু, কাজল-রেখা, প্রেমের সমাধি তীরে, মা হলো বন্দি, জীবন নদীর তীরে, অনুসন্ধান, মা-মাটি-মানুষসহ অসংখ্য জনপ্রিয় ঐতিহাসিক অথবা সামাজিক যাত্রাপালা। এখন যাত্রা মানেই কদর্য নৃত্য-জুয়া-হাউজির ধুন্ধমার কারবার। এখন যাত্রার কথা মনে হলে পুরান, ইতিহাস, মহর্ষী ব্যক্তিত্ব বা লোকজ সাহিত্যে বিখ্যাত চরিত্রের কথা আর মানস পটে ধরা দেয় না, উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে স্বল্প পোশাকে কথিত প্রিন্সেসদের উদ্বাহু নাচ-গানের অশালীন দৃশ্য। ফলে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা যাত্রাপালা এখন বিলুপ্তির পথে।
নেত্রকোনা জেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও যাত্রা শিল্পীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমাদের ভাটি অঞ্চল যাত্রাপালার জন্য বিখ্যাত। বর্তমানে আমাদের এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক গ্রামেই যাত্রাপালার রীতি থাকলেও এখন তা তূলনামূলক ভাবে খুব কমই চোখে পড়ে। তবে আমাদের এলাকায় এখনও দুর্গাপূজা ও শীতের সময় যাত্রাপালার আয়োজন হয়ে থাকে। বাড়ির আঙিনা, ফাঁকা মাঠ কিংবা বালুর চরের কোনো ফাঁকা জায়গায় এর আয়োজন করা হয়। আর এই যাত্রাপালা দেখতে ভিড় জমায় শিশু, কিশোর, জোয়ান, বৃদ্ধ, পুরুষ-মহিলা সবাই। ট্রাজেডি কাহিনি হলে কেউবা কান্নায় ফেটে পড়ে। আর কমেডি হলে হাসির জোয়ার বয়ে যায় সবার মাঝে। এখানকার মানুষের মাঝে যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভালোবাসা এবং সম্পর্কবোধ রয়েছে, তা বুঝা যায় একত্রিত হয়ে যাত্রাপালা দেখার মাঝে দিয়ে।
একসময়ের পেশাদার যাত্রাশিল্পী অমল চক্রবর্তী বলেন, আমি দীর্ঘ ৪০ বছর যাত্রাপালার দলের সাথে কাজ করেছি। যাত্রা যেন আমার হৃদয়ের একটি স্পন্দন। এখনও শীতের সময়ে আমার এলাকার তরুণ-যুবকসহ নানা বয়সী লোকদের নিয়ে যাত্রাপালার আয়োজন করি। এলাকার বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ সবাই একসাথে যাত্রাপালার আনন্দ উপভোগ করি। তবে আগের তুলনায় এখন যাত্রাপালা খুব কম হয়।